সন্দেহপ্রবণতা রোগ সুর করুন খুব সহজেই, কিভাবে জেনেনিন

বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের অন্তর্বর্তী যে নেতিবাচক চিন্তা ও অনুভূতি আমাদের যন্ত্রণা বা কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তার নাম ‘সন্দেহ’। এ সন্দেহ নামক ঘুণপোকা যার মনের ঘরে আশ্রয় নেয়, তাকে একেবারে মানসিক যন্ত্রণার চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায় এবং নিঃশেষ করে ফেলে।

সন্দেহ যেমন হতে পারে খুব স্বাভাবিক পর্যায়ের, আবার তেমনি খুবই অস্বাভাবিক অসুস্থ পর্যায়েরও। ইংরেজিতে এই অসুস্থ পর্যায়ের সন্দেহের নাম ডিলিউশন প্যারানয়েড সাইকোসিস এবং মরবিড জেলাসি। এই অসুস্থ সন্দেহের পেছনে না থাকে কোনো বাস্তব প্রমাণ, না থাকে কোনো যৌক্তিক কারণ। তবে ব্যক্তির মনের মধ্যে এই সন্দেহ মাসের পর মাস বেঁচে থাকে অটলভাবে। সাধারণভাবে সন্দেহকে আমরা সাসপিশাসনেস বলে থাকি, যা যেকোনো মানুষের মধ্যেই আসতে পারে যেকোনো সময়ে এবং যেকোনো কারণে।

নারীদের মধ্যে সুস্থ এবং অসুস্থ পর্যায়ের সন্দেহপ্রবণতা দেখা যায়। প্রথমত একজন নারীর সঙ্গীকে নিয়ে সন্দেহ হতে পারে, বিয়ের আগে প্র্রেমের সময় আবার বিবাহিত জীবনেও। বিয়ে-পূর্ববর্তী সময়ে সন্দেহ আসার সুযোগ অনেক বেশি থাকে, আবার তা শেষ করে ফেলারও সুযোগ থাকে। কেননা তখন পর্যন্ত তারা তাদের সম্পর্কে কোনো আইনগত বা সামাজিক রূপ দেয়নি (বিয়ে)। তবে বিয়ে-পরবর্তী যে সন্দেহ জন্ম নেয়, তা শুধু দুজনকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে তা নয়, বরং সংসার জীবন, সন্তান (যদি থেকে থাকে), আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী- সবাই এর খারাপ ফলাফল ভোগ করেন।

স্ত্রীর সন্দেহের শিকার হতে গিয়ে কিছু কিছু পুরুষ প্রচণ্ড রেগে যান, স্ত্রীর গায়ে হাত তোলেন, গালিগালাজ ও ভাঙচুর করেন। আবার কখনো কখনো ঠাণ্ডাভাবে প্রমাণ সহকারে বোঝানোরও চেষ্টা করেন। কিছু পুরুষ তার স্ত্রীর সন্দেহের ফলে নিজে প্রথম দিকে সন্দেহের কোনো কাজ শুরু করলেও তাড়াতাড়ি তা গুটিয়ে নেন। অর্থাৎ স্ত্রীর সন্দেহ বাড়তে দেওয়ার রাস্তা বন্ধ করে ফেলেন। আবার কিছু পুরুষ অতি সাবধানী হয়ে ওঠেন এবং নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করেন অর্থাৎ ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’- তাদের স্ত্রীরা হয়তো সবচেয়ে হতভাগ্য।

নারীর সন্দেহের কারণ হতে পারে অনেক কিছু নিয়ে, যেমন- সঙ্গীর অন্য নারীর প্রতি দুর্বলতা, চরিত্রগত ত্রুটি, নেশার বস্তু (সিগারেট নিয়েও হতে পারে), বন্ধুদের আড্ডায় সময় দেওয়া, টাকা-পয়সা, সম্পদ, স্ত্রীকে বা সঙ্গীকে না জানিয়ে অন্যদের সাহায্য-সহযোগিতা বা সুযোগ-সুবিধা করে দেওয়া, কোনো অসুখ থাকলে তা নিয়েও সন্দেহ হতে পারে।

অনেক সময় সঙ্গিনী নিজের সম্পর্কে নেতিবাচক আত্মধারণা থেকেও পুরুষকে সন্দেহ করতে পারে, যেমন- আমি দেখতে সুন্দরী নই, অতটা শিক্ষিতও নই, স্মার্ট নই, আমার স্বামী বা সঙ্গী হয়তো আমাকে নিয়ে সন্তুষ্ট নন, হয়তো তিনি অন্য কাউকে নিয়ে সময় কাটাতে পছন্দ করেন ইত্যাদি।

কী করণীয়
* প্রথম আপনার মনের সন্দেহ কী শুধু সন্দেহ (স্বাভাবিক পর্যায়ের), নাকি তা সন্দেহ বাতিক (অসুস্থতা) তা বোঝার চেষ্টা করুন। প্রয়োজনে মনোচিকিৎসকের সাহায্য নিন। লক্ষণীয়, স্বামীর প্রতি সন্দেহের বিষয়টি নির্ভরযোগ্য কারোর সঙ্গে খুলে আলাপ করতে পারেন, এতে মন হালকা হবে, কিন্তু যাকে-তাকে বলে স্বামীর মানসম্মান নষ্ট করবেন না এবং নিজেকেও হাসির পাত্র বানাবেন না।

* সুনির্দিষ্ট বাস্তব কোনো প্রমাণ না থাকলে অকারণে সন্দেহ করবেন না এবং সন্দেহমূলক প্রশ্ন করে সম্পর্কের জটিলতা বাড়াবেন না। কেননা যাকে সন্দেহ করছেন তিনি যদি সত্যিই সন্দেহের কিছু না করে থাকেন, তবে তার জন্য বিষয়টি একই সঙ্গে অপমানজনক, কষ্টকর এবং রাগের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

* যদি সুনির্দিষ্ট বাস্তব প্রমাণ থেকে থাকে, তার পরও আরেকটু সময় নিন, বিষয়টা ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করুন। এক-দুটি প্রমাণের ভিত্তিতেই গর্জে উঠবেন না।

* খুব ইতিবাচক পদ্ধতিতে সুন্দরভাবে স্বামী/সঙ্গীকে আপনার সন্দেহের বিষয়টি জিজ্ঞেস করুন। তিনি যেন এ রকম মনে না করেন যে তাঁর পেছনে টিকটিকি লেগেছে।

* যদি মনে হয় সঙ্গী আপনাকে ভুল বোঝাচ্ছেন, সব কিছু লুকাচ্ছেন, তবে দুজনের সম্মতিতে আলোচনায় বসুন। আপনি আপনার প্রমাণগুলো ইতিবাচক পদ্ধতিতে উপস্থাপন করুন।

* এর পরও যদি আপনি সদুত্তর না পেয়ে থাকেন, তবে তৃতীয় পক্ষের সাহায্য নিন (যাকে আপনার সঙ্গী মেনে নিতে রাজি হবেন), এই তৃতীয় পক্ষ হতে পারে পরিবারের কোনো নিরপেক্ষ সদস্য, কোনো মুরবি্ব। আবার হতে পারেন কোনো কাউন্সিলর অথবা থেরাপিস্ট যার মধ্যবস্থতায় কোনো একটা সমাধানের দিকে যাওয়া যাবে।

* অসুস্থ পর্যায়ের সন্দেহ হলে অবশ্যই অবশ্যই সাইকিয়াট্রিক চিকিৎসক দেখাতে হবে ও ওষুধ সেবন করতে হবে।

সন্দেহ বাতিক নারী-পুরুষ উভয়েরই হতে পারে। ‘সন্দেহ’ একটি চিন্তার পদ্ধতিগত জটিলতা বা রোগ, এটি নারী-পুরুষ যারই হয়ে থাকুক না কেন, এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।