জীবনযাপন

সাবধান! স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে আপনার নাক ডাকা, জানাচ্ছে গবেষণা

ঘুমের মধ্যে নাক ডাকা স্বাভাবিক হলেও স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা চিন্তা করে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা দরকার।

ঠাণ্ডা লাগা বা অ্যালার্জি নাসিকাগ্রন্থিতে বাধার সৃষ্টি করে। ঘুমানোর আগে কিছু বিশেষ পানীয় পান এই সমস্যার সমাধান করতে পারে।

নাসিকা গ্রন্থিতে এমন বাধা রাতে ঘুমের মধ্যে নাক ডাকার অন্যতম কারণ।

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল’য়ের ‘স্লিপ মেডিসিন’ বিভাগের প্রশিক্ষক ও ঘুম বিশেষজ্ঞ রেবেকা রবিন্স সিএনএন’য়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “ঘুমের মধ্যে নাক ডাকা খুব স্বাভাবিক এবং এতে ভয়ের কিছু নেই।”

তবে ‘অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’র অন্যতম প্রধান লক্ষণ হল ‘নাক ডাকা’। এর ফলে ঘুমের মধ্যে মানুষের দশ সেকেন্ড বা তার বেশি সময় শ্বাস ক্রিয়া বন্ধ থাকতে পারে।

“নাক ডাকা জোরে হলে বা নিরবিচ্ছিন্নভাবে এমনটা দেখা দিলে অথবা শ্বাসের সমস্যা সৃষ্টি করলে তা নিয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন” বলেন রবিন্স।

‘অবস্ট্রাকটিভ’ স্লিপ অ্যাপনিয়া’, ‘সেন্ট্রাল স্লিপ অ্যাপনিয়ার’ মতো নয়- যেখানে মস্তিষ্ক মাঝে মধ্যে দেহকে নিঃশ্বাস গ্রহণের সংকেত দিতে ব্যর্থ হয়।

‘অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’ হয় মূলত কোষের মাঝে বাতাস চলাচলের দুর্বলতা, দৃঢ় বা প্রশান্ত কোমল কোষের জন্য।

দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার ‘ক্যাক স্কুল অব মেডিসিন’য়ের ক্লিনিকেল মেডিসিনের অধ্যাপক এবং ঘুমবিশেষজ্ঞ ডা. রাজ দাসগুপ্ত বলেন, “আমরা সাধারণত বুক ও পেটের সাহায্যে বাতাস গ্রহণ আর বের করার চেষ্টা করে থাকি। তবে ‘অবস্ট্রাক্টিভ’ থাকলে এভাবে শ্বাস নেওয়া যাবে না। যদিও আমরা এই লক্ষণগুলোকে খুব একটা গুরুত্ব দেই না। তবে অনেকের ক্ষেত্রে মারাত্মক হতে পারে।”

‘আমেরিকান একাডেমি অব স্লিপ মেডিসিন’ অনুযায়ী, এই বিষয়ে সতর্ক না হলে তা টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, দুশ্চিন্তা বা হতাশা এমনকি অকাল মৃত্যু ঘটাতে পারে।

নাক ডাকা এখানে মূল লক্ষণ। তাই একে কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না।

ডা. দাশগুপ্তা বলেন, “নাক ডাকা স্বাভাবিক। তবে এখানে ক্রমাগত এবং খুব জোরে নাক ডাকার কথা বলা হচ্ছে, যা শুনতে অনেকটা মৃতপ্রায় ভাল্লুক বা ‘জোরাসিক পার্ক’ সিনেমার দৃশ্যের মতো শোনায়। এমন লক্ষণ দেখা দিলে তা ‘অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’র দিকেই নির্দেশ করে।”

ক্লান্তি

দিনে খুব বেশি ক্লান্ত থাকা রাতে ভালো ঘুমের ব্যঘাত ঘটায়। ফলে নাক ডাকাও প্রবল হয়।

রবিন্সের মতে, “দিনে যাদের ঘুম ঘুম ভাব দেখা দেয় তাদের রাতে নাক ডাকার জোরালো সম্ভাবনা থাকে।”

‘স্লিপ ফর সাকসেস’ বইয়ের সহকারী লেখক রবিন্স আরও বলেন, “যারা দিনের যে কোনো সময় যে কোনো জায়গায় ঘুমিয়ে যেতে পারেন তাদের মাঝে অধিকাংশই হন দুর্বল ও ক্লান্ত। আর এদের মাঝে নাক ডাকার প্রবণতাও বেশি।”

পর্যবেক্ষণ

সবাই না হলেও অনেক মানুষই নিজে নাক ডাকেন কি-না তা জানেন না। এমনকি শ্বাস বন্ধের জন্য খুব বেশি খারাপ ফলাফল না হওয়া পর্যন্ত তাদের ঘুমের মাঝে নিঃশ্বাস বন্ধের সমস্যা সম্পর্কে অবগপ্ত নন।

ডা. দাশগুপ্তার মতে, “নাক ডাকার চেয়ে ‘অ্যাপনিয়া’ বা ঘুমের মধ্যে অল্প সময়ের জন্য শ্বাস বন্ধ থাকা বেশি খারাপ। কারণ এতে বাতাস চলাচল বন্ধ হয়ে যায় ফলে শ্বাস নিতে সমস্যা হয়।”

রবিন্সের মতে, “ব্যক্তি যেহেতু নিজে বোঝেন না তাই সঙ্গী যদি খেয়াল করে থাকেন যে পাশের জনের ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হওয়া, নাক ডাকা, কাশি বা হাঁপানোর সমস্যা হচ্ছে তাহলে তা অবহেলা না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।”

উচ্চ রক্তচাপ

‘অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’ অতিরিক্ত দুশিন্তার কারণেও দেখা দেয়। কয়েক সেকেন্ড শ্বাস বন্ধের ফলে দেহে রক্তচাপ বেড়ে যায়। ফলে দেহে মানসিকচাপ বৃদ্ধিকারী হরমোন ‘কেটেকোলামিঞ্জ’ বাড়ে। আর এটাও রক্তচাপ আরও বৃদ্ধি করে।”

দুশ্চিন্তা অনিদ্রার অন্যতম কারণ। তাই ‘অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’র চিকিৎসায় ‘কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেশার’ বা সিপিএপি কেবল ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’র জন্য নয় তা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেও সহায়তা করে।

বিএমআই

দেহের উপযুক্ত ভর নির্ভর করে দেহের উচ্চতা ও ওজনের উপরে যা ‘বিএমআই’ পরিমাপ বলে পরিচিত।

বিএমআই ১৮.৫ থেকে ২৪.৯ এর মধ্যে থাকলে তা স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হয়।

এর মান ২৫ থেকে ২৯.৯ এর মধ্যে হলে বাড়তি ওজন এবং ৩০-এর উপরে গেলে তা স্থূলকায় বলে বিবেচিত হয়।

যারা এই মাত্রার ৩৫-এর বেশি তারা ‘অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’য় ভোগেন। তাই এই সমস্যা সমাধানে ওজন কমানো উপকারী বলে মনে করেন রবিন্স।

বয়স

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পেশি দুর্বল হতে থাকে। তাই পঞ্চাশ পেরুলে অনেকেরই নাক ডাকার সমস্যা দেখা দেয় যা ‘অবস্ট্রাক্টিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’তে পরিণত হতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বেশি বয়সে এই সমস্যা দেখা দেওয়া কম বয়সে হওয়ার চেয়ে কম ঝুঁকিপূর্ণ।

ঘাড় ও গলা

যাদের গলার গড়ন বংশগতভাবেই খানিকটা লম্বা তাদের ‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’ হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

ডা. দাশগুপ্তা জানান, পুরুষের জন্য গলার মাপ ১৭ ইঞ্চির বেশি হওয়া এবং নারীদের জন্য এই মাপ ১৬ ইঞ্চির চেয়ে বেশি হওয়া আশঙ্কাজনক।

লিঙ্গ

পুরুষের দেহের উপরের অংশে মেদের পরিমাণ বেশি হওয়াতে নারীদের চেয়ে ‘অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’ হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

এছাড়াও পুরুষদের মধ্যে যাদের পেটে মেদ আছে এবং যে নারীরা মেনোপোজের সময় পার করছেন তাদের মাঝে ‘অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া’ দেখা দেওয়ার ঝুঁকি থাকে বলে জানান, ডা. দাশগুপ্তা।

চিকিৎসা

‘স্লিপ অ্যাপনিয়ার চিকিৎসায়’  ‘কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেসার’ বা সিপিএপি উপকারী।

এছাড়াও ওজন কমানো এই রোগের ঝুঁকি অনেকটা কমায়।

এক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা মুখে ব্যবহার করার মতো যন্ত্র যা মুখে বাতাস চলাচলে সহায়তা করে তা ব্যবহারের পরামর্শ দেন।

নাসিকা নালীর সমস্যা, টনসিল বৃদ্ধি বা নাসিকা গ্রন্থির পর্দায় কোনো সমস্যা দেখা দিলে তার জন্য বিশেষজ্ঞরা সার্জারির পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

‘স্লিপ অ্যাপনিয়া’র সমস্যা মৃদু হলে সাধারণত চিত হয়ে না ঘুমিয়ে পাশ ফিরে শোয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

এছাড়াও আঁটসাঁট পোশাক পরে রাতে না ঘুমিয়ে বরং ঢিলেঢালা পোশাক পরলে আরামদায়কভাবে ঘুমানো যায়। আর নাক ডাকার সমস্যা কিছুটা কমে।

Related Articles

Back to top button