জীবনযাপন

‘ক্ষুধার্ত পেটই তোমায় সাফল্য এনে দিতে পারে’, আপনি কী জানেন এই ব্যাপারে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পোল্যান্ডের অর্থনীতি যখন ধুঁকছে, দেশবাসী রোগে,শোকে জর্জরিত। ঠিক তখনই (১৯৪৮ সাল) পোল্যান্ডের কাটোয়াইসে জন্ম নিয়েছিল জার্জি। পুরো নাম জুরেক কুকোজকা। ছোটবেলা থেকেই ডাকাবুকো। অ্যাডভেঞ্চারে আগ্রহ। আবার পড়াশুনাতেও মেধাবী। বাড়ি থেকে যখন তখন একা বেরিয়ে পড়তেন পিঠে ঝোলা নিয়ে। দেখতে দেখতে যুবক হলেন জুরেক। পর্বতারোহণের প্রেমে পড়ে গিয়ে যোগ দিলেন স্থানীয় মাউন্টেনিয়ারিং ক্লাবে। ১৯৬৬ সালে পর্বতারোহণের প্রশিক্ষণও নিয়ে নিলেন রাশিয়া ও পোল্যান্ডের সীমানায় অবস্থিত তাতরা পর্বতে।

আল্পস, হিন্দুকুশ ও তাতরা পর্বতে প্রচুর শৃঙ্গ আরোহণ করে দিন কাটছিল। কিন্তু কুকোজকার স্বপ্ন, হিমালয়ে আসা। নিজের ক্ষমতা যাচাই করা। কারণ, ততদিনে ইংরেজ, জার্মান, আমেরিকান, নিউজিল্যান্ডাররা পৃথিবীর প্রায় সবকটি উচু শৃঙ্গে চড়ে ফেলেছে। পিছিয়ে আছে কেবল পোল্যান্ড। এতই অর্থাভাব সারা পোল্যান্ড জুড়ে। পর্বত অভিযানে কে অর্থ দেবে। তাই উচ্চ পর্যায়ের পর্বতারোহণের জন্য সত্তরের দশক পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় পোল্যান্ডকে। তবুও অর্থের অভাবে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকি নিতে হয়েছে। ফলে সে যুগে পোল্যান্ডের পর্বতারোহীদের সাফল্যের হার যেমন ঈর্ষণীয়, মৃত্যুর পরিসংখ্যানও চমকে দেওয়ার মত।

অর্থের অভাব, তবুও অদম্য ইচ্ছা পর্বতারোহণে পোল্যান্ডের নাম সবার ওপরে রাখবেন
কুকোজকা ঠিক করলেন, তিনি এমন কিছু করবেন যা পৃথিবীর ইতিহাস মনে রাখবে। অর্থের জোরে, পোল্যান্ডের আগেই অভিযানে বেরিয়ে পড়া পৃথিবীর ধনী দেশগুলি মনে রাখবে কুকোজকার নাম। এবং তাঁকে অনুকরণ করতে গিয়ে দশবার ভাববে।

অভিযানের জন্য অর্থ ও রসদ সংগ্রহের জন্য আরেকটা যুদ্ধ শুরু করলেন কুকোজকা। মেধাবী কুকোজকা ইলেক্ট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি করলেও মাইনে পান যৎসামান্য। হিমালয়ে অভিযান বিশাল খরচের ব্যাপার। না, কুকোজকা ভিক্ষা করবেন না। খেটে অভিযানের খরচ ওঠানোর চেষ্টা করবেন। তিনি তাঁর দলকে নিয়ে বিভিন্ন কারখানার উঁচু উঁচু চিমনি পরিস্কার করার ও নতুন চিমনি লাগানোর কাজে লেগে পড়লেন। পরবর্তীকালে এই কাজ নিয়ে নুন্যতম হীনমন্যতায় ভোগেননি বরং তিনি গর্বিত ছিলেন।

ক্লাইম্বিং বুট থেকে শুরু করে স্লিপিং ব্যাগ সবকিছুই স্থানীয় মুচি আর দর্জিদের কাছ থেকে বানিয়ে নিতেন কুকোজকা। কয়েকটি সফল অভিযানের পর অতি সামান্য সরকারী অনুদান মিলত। সেটুকুও যাতে না হারাতে হয়, তারজন্য কুকোজকা অভিযানগুলোতে সফল হওয়ার জন্য জীবনকে বাজি রাখতেন। বড় দল নিলে প্রচুর খরচ। তাই কুকোজকা আল্পাইন স্টাইলে আরোহণ করতেন। ‘অ্যাল্পাইনিজম’ শব্দটাকে ভিন্ন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

অভাবের জন্য পোল্যান্ডে সর্বোচ্চ স্তরের অ্যাল্পাইনিজমের চর্চা ও বিকাশ ঘটেছিল। কারণ অ্যাল্পাইনিজম, কুকোজকাদের জন্য পর্বতারোহণের আলাদা কোন স্টাইল ছিল না। এটা ছিল কুকোজকাদের কাছে কম খরচে পর্বত শৃঙ্গে পৌঁছানোর একমাত্র উপায়।

না তাঁবু, বা শেরপার সাহায্য, সোজা বেসক্যাম্প থেকে যাত্রা শুরু করে শৃঙ্গ আরোহণ করে নিচে নেমে আসা। মাঝে থাকতে হলে পাথরের আড়ালে, না হলে বরফে গর্ত খুঁড়ে। কখনও সেকেন্ড হ্যান্ড ফুটিফাটা তাঁবুতে। পাছে ছেঁড়া তাবু আরও ছিঁড়ে যায়, খুব প্রয়োজন না হলে তাঁবুও ফেলতেন না কুকোজকা।

নিজেই নিজের জন্য সবচেয়ে কঠিন রুট আবিস্কার করে নিতেন
অনেক কিছু না পেয়েও পর্বতারোহণে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন কুকোজকা। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৭, আটবছরেরও কম সময়ে পৃথিবীর উচ্চতম ১৪ টি শৃঙ্গ আরোহণ করেছিলেন। ১৪ টি শৃঙ্গ আরোহণ করতে প্রবাদপ্রতীম ও সর্বকালের সেরা পর্বতারোহী রেইনহোল্ট মেসনারের নেওয়া সময়ের (১৬ বছর) চেয়ে অর্ধেকেরও কম সময় নিয়েছিলেন কুকোজকা। তবুও তিনি মেসনারকেই সেরা মানতেন। মেসনারও সমীহ করতেন কুকোজকাকে।

যে রুটে তাঁর আগে কোনও অভিযাত্রী আরোহণ করেছেন সেই রুটে কুকোজকা আরোহণ করতে উৎসাহ পেতেন না। তাই, ১৪টি শৃঙ্গের মধ্যে ১১টি শৃঙ্গ আরোহণ করেছেন নতুন রুটে। তিনিই বিশ্বের একমাত্র ব্যক্তি, যিনি সর্বোচ্চ ১১ টি নতুন রুট আবিস্কার করেছেন।

১৪ টি শৃঙ্গের মধ্যে আবার ৭ টি শৃঙ্গ আরোহণ করেন একা একাই। এবং তিনটে শৃঙ্গ আরোহণ করেন শীতকালে। এবং এভারেস্ট বাদ দিয়ে বাকি ১৩টি শৃঙ্গ আরোহণের সময় বোতলের অক্সিজেন ব্যাবহার করেননি। ভাবুন, সে সময়ে অক্সিজেনবিহীন আরোহণের কথা কেউ চিন্তাও করতে পারতেন না। তাই ইতিহাস আজও কুর্নিশ জানায় কুকোজকাকে।

এক ঝলকে কুকোজকার অসামান্য কীর্তিগুলি

● ১৯৭৯ সালে চিরাচরিত রুটে ( ওয়েস্ট ফেস) লোৎসে (৮৫১৬মি) আরোহণ।
● ১৯৮০ সালে নতুন রুটে (সাউথ পিলার) এভারেস্ট (৮৮৪৮ মি) আরোহণ।
● ১৯৮১ সালে নতুন রুটে (মাকালু লা/ উত্তর-পূর্ব গিরিশিরা) আল্পাইন স্টাইলে মাকালু (৮৪৪৫ মিটার) আরোহণ করেন একা।

● ১৯৮২ সালে পাকিস্তানের ব্রড পিক (৮০৫১ মিটার) আরোহণ করেন চিরাচরিত রুটে আল্পাইন স্টাইলে।
● ১৯৮৩ সালে পাকিস্তানের গাশেরব্রুম-২ (৮০৩৫ মিটার) আল্পাইন স্টাইলে আরোহণ করেন নতুন রুটে (সাউথ-ইস্ট স্পার )

● ১৯৮৩ সালেই গাশেরব্রুম-১ (৮০৮০ মিটার) আরোহণ করেন আল্পাইন স্টাইলে ও নতুন রুটে (সাউথ -ওয়েস্ট ফেস)

●১৯৮৪ সালে পাকিস্তানের ব্রড পিক ট্র্যাভার্স করেন। একই অভিযানে ব্রড পিকের নর্থ, মিডল, রকি ও মূল শৃঙ্গ আরোহণ করেন। যা কিনা কল্পনাতীত।
● ১৯৮৫ সালে বিশ্বের প্রথম আরোহী হিসেবে শীতকালে নেপালের ধৌলাগিরি (৮১৬৭ মিটার) আরোহণ করেন চিরাচরিত রুটে।

Related Articles

Back to top button